দি আলকেমিস্ট- পাওলো কোয়েলহো | The Alchemist- Paulo Coelho

 "When you want something, all universe conspires in helping you to achieve it."

যে বইটি নিয়ে আজ কথা বলতে চাচ্ছি সেটা আপনার জীবন বদলে দেয়ার মতো একটি বই। এবং এই বইয়ে আপনি আপনার স্বপ্নকে ছোঁয়ার অনুপ্রেরণা পাবেন। জীবনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব গুলোকে কাটিয়ে নিজের স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখতে উদ্যম পাবেন।পাশাপাশি শত প্রতিকূলতাকে কাটিয়ে উঠেও কিভাবে লেগে থাকতে হয়, তা শিখবেন।


বলছিলাম, ব্রাজিলীয় ঔপন্যাসিক ও গীতিকার পাওলো কোয়েলহো'র   ''দি আলকেমিস্ট'' বইয়ের কথা। 

'দি আলকেমিস্ট' বইটিকে বলা হয় বিংশ শতাব্দীর সেরা ১০ টি বইয়ের মধ্যে একটি।

বইটি 'নিউইয়র্ক টাইমস্ ' এ বেস্ট সেলার হিসেবে থাকে টানা ৩০০ সপ্তাহ। এখন অবধি এটি ৮০ টিও বেশি ভাষায় অনুদিত হইছে।এটি এখন অবধি  ১৫ কোটিও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে।


বইটির এত সফলতা সম্পর্কে জানার পরে আপনি যদি এই বইয়ের কাহিনী সম্পর্কে জানতে আগ্রহী থাকেন, তবে বাকি লেখাটুকু আপনার জন্য। পরিশেষে আমি উল্লেখ করবো,বইটি পড়ে আমি কি শিখলাম।


বইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র 'সান্তিয়াগো'  হলেও বইয়ের নাম চরিত্র হলো 'দি আলকেমিস্ট '।  এই আলকেমিস্ট ই সান্তিয়াগোকে গুপ্তধন খুঁজে পেতে পথ দেখান।

এছাড়াও আরও কিছু চরিত্র এই গল্প আছে,সেগুলো আমরা গল্পের ধারাবাহিকতায় জানতে পারবো।


দূর দিগন্তে বালির ঝড়ের মতো উড়ে আসা এক স্বপ্ন যেন তাড়া করে ফিরছিল সান্তিয়াগো নামের এক সাধারণ মেষপালককে। বারবার তার চোখে ভেসে উঠত সেই একই দৃশ্য— মিশরের পিরামিডের পাদদেশে লুকানো অমূল্য রত্নভাণ্ডার। স্বপ্ন তো মায়াময়, ক্ষণিকের ভুলে যাওয়া ছবি, কিন্তু সান্তিয়াগোর সরল মনে সেই স্বপ্ন গেঁথে গেল গভীর বিশ্বাসে।


একদিন পথের ধারে জটাজুটধারী এক বৃদ্ধের সাথে তার দেখা। শুভ্র কেশ, শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তিনি পরিচয় দিলেন সালেমের রাজা মেল্কিসেডেক নামে। সেই রহস্যময় বৃদ্ধ যেন সান্তিয়াগোর মনের কথা জানতে পারলেন। তার স্বপ্নের কথা শুনে মৃদু হাসলেন এবং সেই গুপ্তধনের সন্ধানে যাত্রা করার জন্য তাকে উৎসাহিত করলেন। যেন এক অচেনা পথের হাতছানি দিল তার ভবিতব্য।


ভেড়াগুলির মায়া,পরিচিত পথের আকর্ষন তুচ্ছ করে সান্তিয়াগো ধরলো এক অনিশ্চিত অভিযাত্রার হাল।

ধু-ধু মরুভূমির রুক্ষতা, অচেনা শহরের কোলাহল— কত না তিক্ত অভিজ্ঞতা আর অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ তার ভাগ্যে জুটল। কখনও কপর্দকহীন হয়ে পথে পথে ঘুরেছে, আবার কখনও খুঁজে পেয়েছে অপ্রত্যাশিত সহৃদয় মানুষের সঙ্গ।


মরুভূমির বুকে এক মরূদ্যানে দেখা হল ফাতিমা নামের এক বেদুইন কন্যার সাথে। তার কাজল কালো চোখের গভীরে সান্তিয়াগো যেন খুঁজে পেল তার ক্লান্ত হৃদয়ের আশ্রয়। ধীরে ধীরে সেই বালিকার নীরব চাহনি আর স্নিগ্ধ ব্যবহারে বাঁধা পড়ল তার মন। যাত্রায় সাক্ষাৎ হলো এক ইংরেজ লোকের সাথে,যে সারা জীবন ধরে খুঁজেছে এক আলকেমিস্টকে - যিনি সীসাকে সোনা বানাতে জানেন। এরপর পরিচয় হল সেই জ্ঞানবৃদ্ধ অ্যালকেমিস্টের সাথে, যাঁর রহস্যময় জ্ঞান আর প্রকৃতির গোপন ইঙ্গিতের পাঠ সান্তিয়াগোর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।


দীর্ঘ পথ, বন্ধুর পথ। কত ঝড়ঝঞ্ঝা পেরিয়ে, কতবার আশাভঙ্গের তিক্ততা অনুভব করে সান্তিয়াগো অবশেষে পৌঁছালো সেই পিরামিডের পাদদেশে। কিন্তু সেখানে পৌছে সে কোনো গুপ্তধন পায়নি।

কিন্তু সে যা আবিষ্কার করেছিলো, তা হয়তো তার কল্পনারও বাইরে ছিল। গুপ্তধন সবসময় মাটির নিচে লুকানো থাকে না, কখনও কখনও তা লুকিয়ে থাকে নিজের হৃদয়ের গভীরে, নিজের ভেতরের সত্যকে উপলব্ধি করার শান্ত মুহূর্তে।

মিসরের পিরামিড দেখা তার স্বপ্ন ছিলো, সে গুপ্তধনের সন্ধানে নামার কারনে তার এই স্বপ্নটাও পূরণ হয়েছিলো।

কিন্তু প্রকৃতি তাকে নিরাশ করেনি,সে গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছিলো তার চিরচেনা শহরে,যেখানে শুয়ে সে বারবার গুপ্তধনের স্বপ্ন দেখতো।


পাওলো কোয়েলহোর ‘দি আলকেমিস্ট’—এ কেবল একটি বালকের গুপ্তধন খোঁজার কাহিনি নয়, বরং জীবনের গভীরতর সত্যের এক শান্ত অথচ জোরালো প্রতিচ্ছবি। এই কাহিনীর প্রতিটি বাঁকে বাঁকে যে শিক্ষাগুলি নিহিত রয়েছে, তা যেন আমাদের পথ চলার পাথেয়স্বরূপ।

এবং এগুলো আমি নিম্মে উল্লেখ করছি...........


প্রথমত, এই বইটি আমাদের নিজের হৃদয়ের ডাক শুনতে শিখায়। সান্তিয়াগো শিক্ষিত বালক হওয়ার পরেও সে একজন মেষপালক হয়। কারন তার বিশ্ব ঘুরে দেখতে মন চাইতো। সে আবিষ্কার করেছিলো যদি সে মেষপালক হয় তবে সে বিশ্ব ঘুরে দেখার সুযোগ পাবে। আবার ভেড়া ও ভেড়ার পশম বিক্রি করে সে জীবিকা নির্বাহও করতে পারবে। 

আবার সান্তিয়াগো যখন বারবার একই স্বপ্ন দেখে, তখন সমাজের বাঁধা গতের জীবন তাহার আর ভালো লাগে না। এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা তাহাকে টানে সেই দূরের পিরামিডের দিকে।



দ্বিতীয়ত, বইয়ের মধ্যে একটা জায়গায় লেখা আছে.....

"রত্নের খোঁজে একজন খনি শ্রমিক পরিবার-পরিজনসহ সমস্ত কিছু পরিত্যাগ করে একটা নদীর তীরে লক্ষ লক্ষ পাথর পরীক্ষা করে। আর অল্প কিছু পাথর পরীক্ষা করলে ই সে মহামূল্যবান রত্ন পাথরটি পেয়ে যেত। কিন্তু সে ওই সময় হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয়। অথচ, সে এই রত্নটি খোঁজার জন্য তার জীবনের সব কিছু ত্যাগ করেছিলো।"

আমরাও আমাদের জীবনে কোনো না কোনো কাজে সারাজীবন ব্যয় করি। অথচ,হতাশ হয়ে, আগ্রহ হারিয়ে ফেলে সেই কাজটা ঠিকভাবে করি না। হয়তো কাজটা ছেড়েও দেই।

এভাবে ই জীবনের রত্নলাভ থেকে আমরা বঞ্চিত হয়ে পড়ি।


তৃতীয়ত, এই বইয়ে একজন জ্ঞানী ব্যক্তির কথা উল্লেখ আছে। লোকটির কাছে একটি ছেলে সুখের গোপন রহস্য জানতে গিয়েছিলো। জ্ঞানী লোকটি ছেলেটির  হাতে একটা চামচে দুই ফোঁটা তেল দিয়ে বলেছিলেন, " আমার এই প্রাসাদ পুরোটা ঘুরে আসবা। কিন্তু ঘুরে বেড়ানোর সময় এই চামচটির দিকে লক্ষ্য রাখবা,তেল যেন পড়ে না যায়।"

ছেলেটি পুরো প্রাসাদ ঘুরে আসে। তেল একটা ফোঁটাও পড়ে যায়নি। কিন্তু সে পুরো প্রাসাদ ঘুরলেও, সে প্রাসাদের কোনো সৌন্দর্য ই উপভোগ করেনি। কারন তার সম্পূর্ণ খেয়াল ছিলো চামচের প্রতি।


জ্ঞানী লোকটি ছেলেটিকে আবার প্রাসাদের সৌন্দর্য উপভোগ করে এসে তাকে বলতে বলে।

ছেলেটি এবার প্রাসাদের সৌন্দর্য উপভোগ করে এবং মুগ্ধ হয়। এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রাসাদের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে পারে।  কিন্তু এবার চামচে রাখা তেল পড়ে গিয়েছিলো।


এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি, জীবনে সুখী হতে চাইলে সবকিছু উপভোগ করার মানসিকতা রাখতে হবে। কিন্তু একটা জায়গায় গন্ডিভূত হয়ে থাকলে হবে না। 


চতুর্থত, এই কাহিনী সাহস সঞ্চয় করতে শেখায়। সান্তিয়াগোর যাত্রা সহজ ছিল না। পথে বহু বাঁধা এসেছিলো, বহুবার সে প্রতারিত হয়েছিলো, নিঃস্ব হয়েছিলো। কিন্তু কোনো বাধাই তাকে তার লক্ষ্য হতে বিচ্যুত করতে পারে নাই। আমাদের জীবনেও যখন কঠিন পরিস্থিতি আসে, তখন মনে হয় যেন আর পথ নাই। কিন্তু এই বইটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ভয়কে জয় করে ই জীবনের আসল পথে অগ্রসর হওয়া যায়।


পঞ্চমত, ‘দি আলকেমিস্ট’ আমাদের দেখায় যে, জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা মূল্যবান। মরুভূমির দীর্ঘ পথ, অচেনা মানুষের সঙ্গ, প্রেম—সান্তিয়াগোর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তাকে কিছু না কিছু শিখিয়েছে। ভালো-মন্দ সকল অভিজ্ঞতাই আমাদের ভিত গড়ে তোলে। কোনো অভিজ্ঞতাই বৃথা যায় না, যদি আমরা তাহার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারি।


ষষ্ঠত, এই গল্পে একজন স্ফটিক ব্যবসায়ী আছেন,যার ছোট থেকে স্বপ্ন মক্কায় যাবেন,হজ্জ করবেন। সেই আশা নিয়ে ই সে জীবনের শেষ প্রান্ত এসে দাঁড়িয়েছেন। তার সামর্থ আছে,কিন্তু সাহস নাই।কারন তার এই স্বপ্নটি পূরণ হয়ে গেলে বাকি জীবন সে কোন আশায় বাঁচবেন!


কিন্তু এই বইটি ‘ব্যক্তিগত কিংবদন্তী’র কথা বলে। আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই একটি নিজস্ব লক্ষ্য থাকে, একটি স্বপ্ন থাকে, যা আমাদের পূর্ণতা দিতে পারে। সেই কিংবদন্তীকে অনুসরণ করাই জীবনের সার্থকতা। সমাজের চাপ, পারিপার্শ্বিকতার বাঁধা,ভয় অনেক সময় আমাদের সেই পথ হতে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু ‘দি আলকেমিস্ট’ দৃঢ়ভাবে বলে, নিজের স্বপ্নের পথে অবিচল থাকাই জীবনের পরম সাধনা।


এই বইয়ের সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এই যে, আমাদের গুপ্তধন হয়তো দূরে কোথাও লুকানো নাই। সান্তিয়াগো যখন বহু দূর পথ অতিক্রম করে পিরামিডে পৌছায়, তখন সে বুঝতে পারে আসল ধন তাহার নিজের হৃদয়ের উপলব্ধি, তার যাত্রার অভিজ্ঞতা। অনেক সময় আমরা যা খুঁজি, তা হয়তো আমাদের অতি কাছেই লুকানো থাকে, কেবল আমরা বাহিরের চাকচিক্যে অন্ধ হয়ে তা দেখতে পাই না।


মোটকথা, ‘দি অ্যালকেমিস্ট’-এর এই কাহিনী আসলে এক নীরব আহ্বান— নিজের ভেতরের স্বপ্নকে চেনার, সেই পথে একা হেঁটে চলার সাহস রাখার এবং জীবনের প্রতিটি ধূলিকণাকেও মূল্যবান জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করার। দূরের হাতছানি হয়তো ক্ষণিকের, কিন্তু নিজের অন্তরের ডাকই জীবনের আসল পথ দেখায়। আর সেই পথেই লুকিয়ে থাকে পরম প্রাপ্তি, যা হয়তো বাইরের ঐশ্বর্যের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান।


~এস.এম. বায়েজীদ আহমেদ 

সাহিত্য বিষয়ক পোস্ট পেতে যুক্ত হতে পারেন-

বইপ্রেমীর বারান্দা


#দি_আলকেমিস্ট

#পাওলো_কোয়েলহো

#বুক_রিভিউ





মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হুমায়ূন আহমেদের 'অপেক্ষা' উপন্যাস | বুক রিভিউ | Opekkha by Humayun Ahmed | Book Review